মিয়ানমার শরণার্থী: সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই

১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসলে মিয়ানমারে পশ্চিমাঞ্চল থেকে বাড়িঘর পুড়িয়ে, গুলি করে তাড়িয়ে দেওয়া নাগরিকদের নিয়ে দুকথা শুনিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপারে জোর আলোচনা চারদিকে। তবে যে হারে মিয়ানমারের অধিবাসীরা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তাতে দুই সপ্তাহ পর আরাকান তথা রাখাইন রাজ্যে আর কোনো জাতিগত সংখ্যালঘু অবশিষ্ট থাকবে কি না, সন্দেহ। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জাতিসংঘের সেই অধিবেশন ফাটিয়ে দেবেন বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন।
তুরস্ক এখন বদলি ব্যবস্থার বদৌলতে জেদ্দাভিত্তিক ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (সম্মেলন) বা ওআইসির চেয়ারম্যান। এরদোয়ান বলেছেন, ‘আমি তিন দিন ধরে বারবার ফোন করতে করতে হয়রান। কেউ এগিয়ে না এলে তুরস্ক নিজেই যা করার করবে।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, এসবই তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং হতাশার বহিঃপ্রকাশ। আদতে তাঁর কথা কেউ শুনছে না।
ওআইসির ভেতরেই কন্টাক্ট গ্রুপ অন মিয়ানমার বা মিয়ানমার-সম্পর্কিত বিশেষ একটি উপকমিটি আছে। বছর দশেক আগে গড়ে তোলা এই কন্টাক্ট গ্রুপ বা পরামর্শক উপকমিটির অনেক বৈঠক কোরামের অভাবে বসতেই পারেনি। এই কমিটির গঠনপ্রক্রিয়াতেই গলদ থাকায় শুরু থেকেই কমিটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বা বলা যায়, একেবারে চলছে না। কমিটিতে আছে পরস্পরের মুখ দেখাদেখি নেই এমন সব দেশ। মিসর ও তুরস্ক দুই মেরুর দুই দেশ। আবার সৌদি আরবের সঙ্গে মিসরের দহরম-মহরমের শেষ নেই। মুসলিম দুনিয়ার মাতবর বানর দৌড়ে মত্ত এই তিন দেশের মিয়ানমারের সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? মিয়ানমারের ‘বিতর্কিত নাগরিক’দের নিয়ে মুশকিলে আছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আর চরম দুশ্চিন্তায় আছে বাংলাদেশ। কিন্তু জিবুতির এসব কিছুই নেই। এই কটি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, সৌদি আরব ও মিসর একদিকে, তুরস্ক মাঝখানে এবং আর একদিকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। জিবুতি সৌদি আরবের সঙ্গে চলতে পছন্দ করে। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও বাংলাদেশের তালের ঠিক নেই। কারণ বাংলাদেশের এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই, কোনো অবস্থানও নেই। অবস্থান নেওয়ার মতো বুকের পাটা না থাকুক, দিলের তামান্না তো থাকতে পারে। বড় হুজুরদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্মগত অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন হলো না। একানব্বইয়ে যা ছিল, এখনো তা-ই আছে। ৯১-৯২ সালে বানের জলের মতো রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা নিঃস্ব জাতিগত সংখ্যালঘুরা যখন আশ্রয়ের আশায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিল, তখন সদ্য ক্ষমতায় আসা দলের বেসামরিক-সামরিক আমলা থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা পর্যন্ত বোঝালেন, ওরা খুবই আতরাফ শ্রেণির মানুষ। ওদের জায়গা দেওয়া যাবে না। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার জাপানের মিসেস ওগাতাকেও পত্রপাঠ বিদায় করে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। সোজা আঙুলে ঘি ওঠাতে না পেরে ওগাতো ফিরে গেলে বাঁকা আঙুল নিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এবার ঘি ওঠে। এর মধ্যে কোনো রকম অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে আকাশসীমা লঙ্ঘন করে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নানা ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে প্যারিসভিত্তিক সাহায্য সংস্থা এমএসএফ বা ‘সীমান্তহীন ডাক্তার’-এর একটা কার্গো বিমান অবতরণ করে।
শরণার্থীরা ত্রাণের অভাবে রাস্তার পাশে ধুঁকছে আর বিমানবন্দরে ত্রাণ বোঝাই উড়োজাহাজ পড়ে আছে—আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সে খবর ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায়। বাংলাদেশ এমএসএফকে অনুমতি দেয়। শুরু হয় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মিয়ানমার-বিষয়ক কার্যক্রম। এবার সেসব নাটক নেই, কিন্তু নিপীড়িত মানুষ আসছে, আহত মানুষ আসছে, পরিবারবিচ্ছিন্ন মানবশিশু আসছে দলে দলে।
এসব অসহায় মানুষের পাশে যে ধরনের মানবিক আর সহমর্মিতা নিয়ে আমাদের দাঁড়ানো দরকার ছিল, আমরা তা করছি কি? মিয়ানমারের এসব মানুষের প্রতি আমাদের আরও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করা উচিত। চলে আসা এসব মানুষকে নিয়ে আমাদের নানা সত্য-মিথ্যা মেশানো ধারণা আছে, যার সবটা সত্য নয়। অসহায় মানুষকে তার ন্যূনতম বাঁচার সুযোগ না দিলে যে তার নিজের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা করবেই। এমন সব জীবিকা আর বেঁচে থাকার পথ সে বের করবে, যা প্রকৃতি, প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, অবকাঠামো, সংস্কৃতি সবকিছু ওলট-পালট করে দিতে পারে।
শরণার্থীদের অতিথি বা মেহমানের দৃষ্টিতেই আমাদের দেখা উচিত। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চয় অনেক তৎপর, কিন্তু মানুষ কিছু জানছে না। মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রতিদিন ব্রিফিং করা। কী ঘটছে, কী ঘটতে পারে, তার একটা বয়ান দেশের মানুষকে না জানালে, সরকারের নীতির পক্ষে জনসমর্থন উঠবে কীভাবে। বাংলাদেশ এখনো ওআইসির একটা জরুরি সভা ডাকতে পারে। সেখানে মিয়ানমারসহ আসিয়ানভুক্ত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ছাড়াও আরও দু-একটা দেশকে ডাকা যেতে পারে একটা সুরাহার জন্য। কিছু না হোক ওআইসির মিয়ানমার-বিষয়ক গ্রুপ যার অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ, তার তো একটা রুদ্ধদ্বার বৈঠক ঢাকাতেই হতে পারে। মিসর, সৌদি আরব, জিবুতি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া আর বাংলাদেশকে নিয়ে গঠিত এই গ্রুপ একসঙ্গে কাজ করে জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ সভায় একটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।
শরণার্থীর চাপে আমাদের নাভিশ্বাস উঠলেও ছটফটানির কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করছে যেসব প্রতিষ্ঠান (ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফ, আইওএম, আইএফআরসি, রেডক্রস, এমএসএফ, এসিএফ) এবং তাদের দেশীয় সহযোগী সংস্থাদের নিয়ে একটা উচ্চপর্যায়ের সভাও এখন পর্যন্ত ডাকা হলো না। এসব না হওয়ায় একটা কারণ আমরা কী করব, না করব তা ঠিক করার দায়িত্ব মনে হয় অন্য কারও। সেই অন্য কেউ হয়তো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে অন্য কোনোভাবে অন্য কিছু ভাবছে।
মিয়ানমারের শরণার্থী নিয়ে সবচেয়ে তেতে ওঠা তুরস্কের সঙ্গে আমরা হাত মেলালে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ সেই ভাবনায় কি আমরা অস্থির। যে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় আমরা সৈন্য পাঠাতে প্রস্তুত তাদের কাছে কি আমরা দূত পাঠিয়েছি? নাকি সেটা আবার ‘অসভ্যতা’র পর্যায়ে পড়বে। আমরা না হয় চীনা ভাষায় দুর্বল, তাই চীনের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলছি না। কিন্তু কুছ কুছ হিন্দি তো জানি যেটা ইস্তেমাল করে ভারতের সঙ্গেই বা আনুষ্ঠানিক বাতচিত করছি না কেন।
এই সংকটে দ্বিপক্ষীয় আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টাকেও। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যা-ই ঘটুক না কেন, আমাদের ঘরে যারা বাধ্য হয়ে ঢুকছে এবং তাদের রক্ষার ব্যবস্থা না করে নানাভাবে হেনস্তা করে (টাকাপয়সা, গবাদিপশু কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এখন নিত্যদিনের ঘটনা) আমরা ঢুকতে দিচ্ছি তাদের কী অবস্থা, তার কোনো হিসাব রাখছি না। এ কেমন তামাশা। যে মানুষই আসছে তার একটা রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন রক্ষার কাজ আমাদের স্বার্থেই করা উচিত। সংখ্যা এখন পর্যন্ত চোখের আন্দাজ আর মনের ভাবনা দিয়ে তৈরি। নিবন্ধনের অনেক আধুনিক আর ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতি এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হাতের মুঠোয়। এসব পদ্ধতিতে নিবন্ধন করতে তারা চট করে হাওয়া হয়ে যেতে পারে না। যেখানেই যাক সন্ধান করা যায়। কোন চিন্তায় কার স্বার্থে এটা আমরা করছি না?
কফি আনান কমিশনের রিপোর্টটা কি আমরা পড়ে দেখেছি? সেটাকে আমলে নিয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা যায়। তা ছাড়াও আছে ২০০৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত ৬৪/২৩৮ নম্বর প্রস্তাব।
২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর ওআইসি ডেলিগেশনের সঙ্গে মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা কমিটির প্রধান ড. সাই মাযুক কামের বৈঠকে অর্জিত সমঝোতাকে তো কাজে লাগান যায়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট মিয়ানমার শরণার্থীনীতি না থাকলে সে আলোচনা ঘুরপাক খাবে আলোচনাতেই। আমাদের এখনই একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণকে অন্ধকারে রেখে সে সিদ্ধান্ত কি নেওয়া যাবে? মাল্টা থেকে ধেয়ে আসা উদ্ধারকারী জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর আগেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *